সোনাকাটা ইকোট্যুরিজমঃ ২০– সালে গড়ে উঠে বরগুনা জেলার নবগঠিততালতলী উপজেলার ফাতরার জঙ্গলে সোনাটাকা ইকোট্যুরিজম। এ স্থানটি উপজেলা থেকে ১৮ কিলোমিটার দক্ষিনে সাগর মোহনায় সোনাকাটা ইউনিয়নের ৪৩নং ট্যাংরাগিরি মৌজায়। নভেম্বর মাস থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত দেশ বিদেশের
বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। এখানে দেখতে পাবেন বন্য হরিণের ছোটাছুটি, মেসোবাঘ, কুমির প্রজনন কেন্দ্র, শুকর, ডোরা বাঘের দল, বন্য মহিষ, বানর, বড় অজগর, লাল কাকরার দল ও বিভিন্ন প্রজাতির পাথি।

সোনারচর-আশারচরঃ তালতলী উপজেলার সোনারচর টেংড়াগিরী মৌজায় অবস্থিত। এলাকাটি বনজ সম্পদে পূর্ণ। সমুদ্রতীরের এ এলাকা বিভিন্ন নদী/খাল দ্বারা বিভাজিত। স্থানীয়ভাবে এ বন ফাতরার জংগল নামে পরিচিত। সমুদ্রতীরবর্তী হরিণঘাটা মোহনায় এর অবস্থান। এ বন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভুমি। বন ও সমুদ্রের অপুর্ব সম্মিল ঘটেছে এখানে। বগীর ফকির হাট থেকে ট্রলারে যেতে হয় সোনারচরে। বনবিভাগ সৃজিত এ বনে বিভিন্ন প্রজাতির বনজ বৃক্ষ রয়েছে। বানর, বনমোরগ, শিয়াল, বেজি. চিতাবাঘসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর এবং পাখির অভয় আশ্রম এ সোনারচরে। শীতকাল আর বসন্তের পাতাঝরা মৌসুমে সোনারচর এক অনাবিল সৌন্দর্যে ভরে ওঠে। পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি থাকলেও এর যাতায়াত ব্যবস্থা দুর্গম হওয়ার কারণে এলাকাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি। বেশ কয়েক ঘর মৌসুমী জেলের বসতি এখানে। সমুদ্র থেকে মৎস্য আহর ও শুটকি উৎপাদন এদরে কাজ। সোনারচরে সুর্যাস্তের সোনালী আভা বনের বৃক্ষরাজিতে সোনালী বিচ্ছুরণ ঘটায়। এ সৌন্দর্যের তুলনা নেই। এ সৌন্দর্য যারা একবার উপভোগ করেছেন, তারা শত বাঁধা উপেক্ষা করে সেখানে যাবেন বারেবারে। ফাতরার জঙ্গলখ্যাত সোনারচর আর আশারচরের মোহনীয় হাতছানি ভ্রমণ পিপাসুদের পক্ষে উপেক্ষা করা কঠিন। আশা করা যায় আমতলী-তালতলী-সোনারচর (পর্যটন কেন্দ্র) সড়কটির চলমান নির্মাণ কাজ শেষ হলে আশারচর নতুন আশা জাগাবে আমতলীর বুকে আর সোনারচর বয়ে আনবে সোনালী সমৃদ্ধি। সাগরের বুক চিরে জেগে উঠা ফাতরার সোনাকাটা ইকোট্যুরিজম প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্যময় দ্বীপ হাসার চর। এ চরের এক জায়গায় দাড়িয়ে অবলোকন করা যায় সূর্য উদয়াস্ত। এর তিন দিকেই দিগন্ত বিস্তৃত বঙ্গোপসাগরের অথৈনীল জলরাশী উথাল পাতাল ঢেউ দীর্ঘ সমুদ্র সৈকতের জোয়ারের সময় ছন্দাকারে আছরে পরে দৃস্টি নন্দন ভাবে।

গাজী কালুর দরগাহঃ গাজী কালু এক কিংবদন্তী। যখন এসব অঞ্চল গভীর অরণ্যতে পূর্ণ ছিল সেই দূর অতীত থেকে প্রচলিত এই কাহিনী। জানা যায়, গাজী এবং কালু শাহ নামক দুই সাধক পীর তাদের সাধনার দ্বারা বন-জংগলের সমস্ত হিংস্র পশু পাখির উপর কর্তৃত্ব লাভ করেন। তাদের কথা বা নির্দেশ ছাড়া হিংস্র পশুকুল কাউকে আক্রমণ করত না। এ বিষয়টি সু্‌দরবনের মধু, মোম আহরণকারী, বাওয়ালী ও জেলেরা জানত। তাই তারা বনে নামার আগে গাজী কালু পীরের দরগায় মানত করতে যেন তারা হিংস্র জন্তু আক্রমন থেকে নিরাপদ াকতে পারে। আমতলী উপজেলা হলদিয়া ইউনিয়নের দক্ষিন টেপুরা মৌজায় এই গাজী কালুর দরগা অবস্তিত, স্থানীয় ভাবে জানা যায় গাজী ও কালু পরস্পর দুই ভাই মতান্তরে মামা ভাগিনা ছিলেন। তাঁরা ছিলেন জাগ্রত পীর। মাঝে মাঝেই তারা এই টেপুরার দরগায় সাধনের জন্য বসতেন। এখানে তাদের দরগাহ বাড়িতে দুজনের ধ্যানের জন্য দুটি আসন রয়েছে। কাছাকাছি রয়েছে একটি পাকা ইন্দিরা, সামান্য দূরে রয়েছে তাদের শিষ্য বা বারো আউলিয়ার বসার স্থান। এলাকাটি দুর্গম, যথাযথ ভাবে সংরক্ষিতও নয়। কিন্তু প্রতিদিন বিপুল সংখাক পুন্যার্থী আগমন করেন এই মাজারে। প্রতি বছর ২৯ মাঘ ও ২৯ ফাল্গুন এখানে ওরশ অনুষ্ঠিত হয়। এখন আর সেই ঘন বন নেই, নেই এখানে সেই হিংস্র পশুও, কিন্তু রয়ে গেছে গাজী কালুর দরগাহ আর তাঁদের সেই কীংবদন্তী। এখনো সুন্দর বনের কাঠ-মধু-মৎস্য আহরণকারীরা পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করে গাজী কালুর নাম।

চাওড়া মাটির দুর্গঃ আমতলী উপজেলার চাওড়া ইউনিয়নের পাতাকাটা গ্রামে একটি সু-উচ্চ মাটির ঢিবি দেখা যায়। মনে করা হয় এটি একটি মাটির দুর্গ। মোগল যুগে মগ পর্তুগীজ জনদস্যুদের দমনের জন্যে শাহ সুজা, শায়েস্তা খা, আগাবাকের খা ও পরবর্তী সুবেদারগণ বৃহত্তর বরিশাল এলাকায় বহু মাটির দূর্ঘ নির্মাণ করেছিলেন, এটি তারই একটি। চন্দ্রদ্বীপের রাজা কন্দর্পনারায়ণ, রামচন্দ্র ও কীর্তিনারায়ণ, গুঠিয়া, রায়পুরা, জাগুয়া, কাগাগুরা, নথুল্লাবাদ, হলুদপুর, রহমতপুর, কাশীপুর, রাজাপুর প্রভৃতি স্থানে দূর্ঘ নির্মাণ করেছিলেন। রেনেলের ১৭৬৪-১৭৭২ খ্রিস্টাব্দের মানচিত্রে রামনাবাদ নদীর তীতে রাজা কন্দর্পনারায়ণ নির্মিত দুটি দূর্ঘ দেখা যায়। বর্তমানে দূর্ঘ দুটির কোন চিহ্ন নেই। আগুনমুখা নদীতে প্রায় ১০০ বছর আগে দূর্ঘ দুটি বিলীন হয়ে যায়। চাওড়া মাটির দূর্ঘটি আমতলীর চাওড়া নদীকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছিল। চাওড়া নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ কি.মি. এখন আর নদীর সেই উন্মত্ত প্রবাহ নেই তাই শুধু কালের সাক্ষী হয়ে দূর্ঘটি ঢিবি আকারে আজও টিকে আছে।

ফকিরখালী গ্রামের দীঘি ও মাটির টিলাঃ সুলতানী আমলে বরিশালে মুসলমানদের আগমন ঘটে। মোঘল জাহাঙ্গীরের সময়ে পটুয়াখালীতে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ সময়ে আরব, ইরান, ইরাক ও দিল্লী থেকে অনেক পীর আউলিয়া ও অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে আসেন। তারা দীর্ঘ খনন করে মসজিদ ও হানকা শরীফ নির্মাণের জন্য জায়গা উচু করতেন। ফকিরখালী গ্রামে তেমন একটি দীঘি ও উচ্চ মাটির টিলা দেখা যায়। ধারণা করা হয়, এখানে কোন পীর অথবা ফকিরের আস্তানা ছিল। গ্রামের নামের সাথে উক্ত ফকির শব্দটি জড়িয়ে থাকায় এ ধারণা যুক্তিসঙ্গত বলে অনেকে মনে করেন।

তালতলীর বৌদ্ধ মূর্তিঃ আমতলী উপজেলার তালতলী রাখাইন প্রধান এলাকা। এখানে একাধিক রাখাইন বৌদ্ধ মন্দির রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান একটি মন্দির ছিল তাঁতীপাড়ায়। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, সাধীনতার পর তাঁতীপাড়ার রাখাইন সমপ্রদায়ের লোকজন হ্রাস পেতে থাকলে পার্শ্ববর্তী কলাপাড়া উপজেলার জনৈক থঞ্চানন মাষ্টার সেই তাঁতীপাড়ার মন্দির থেকে অষ্টধাতুর তৈরী আশি মণ ওজনের বুদ্ধ মূর্তিটি চট্টগ্রাম হয়ে বার্মায় নিয়ে যাওয়ার জন্যে সামপানে তুলে রওয়ানা দেয়। তখন বড়বগী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অংকুজান তালুকদার, চানজোয়া তালুকদার, মংখেলা, আমজাদ মৃধা প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ স্থানীয় লোকজন নিয়ে মূর্তিসহ নৌকাটি আটক করেন। এ সময় রাখাইন নেতৃবৃন্দ মূর্তিটি পার্শ্ববর্তী তালতলী জয়ারামা বৌদ্ধ মন্দিরে (তালতলী বৌদ্ধ বিহার) প্রতিস্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেন। সেই থেকে মূর্তিটি তালতলী মন্দিরে রয়েছে। ধর্মপ্রাণ রাখাইন সমপ্রদায়ের লোকজন পরম শ্রদ্ধায় অষ্টধাতু নির্মিত এ মূর্তিতে তাদের পূজা দিয়ে থাকেন। জানা যায়, মূর্তিটি ১৯১৬ সালে নলবুনিয়া আগাপাড়াতে তৈরী হয়। আশিমণ ওজনের এ মূর্তির সমপূর্ণ অংশ খাঁটি সোনার প্রলেপে ঢাকা। তালতলীতে আগত পর্যটকদের জন্য এই বুদ্ধ মূর্তি অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

পায়রা নদীর পাড়ঃ আমতলী উপজেলার বড়বগী, পচাঁকোড়ালিয়া, আপড়পাংগাশিয়া, আমতলী ইউনিয়ন, আমতলী পৌরসভা, চাওড়া ও গুলিশাখালী ইউনিয়নের কোল ঘেষে পায়রা নদী প্রবাহিত। এ নদীর আমতলী পৌর এলাকার দেড় কিলোমিটারে রয়েছে কংক্রিটের ব্লক। এখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে গ্রীস্ম ও শীত মৌসুমে এ নদীর পাড়ে ভ্রমন পিপাশুদের কোলাহল দেখা যায় ও বিভিন্ন স্থান থেকে পিকনিক করে থাকে। এ রকম স্থান এ বিভাগে বিরল।

যোগাযোগ-
কোন পথে যাবেন এসব পর্যটন কেন্দ্রগুলো দেখতেঃ
বাস- ঢাকা থেকে প্রতিদিন সকাল ৭ থেকে ১০ টা এবং রাত ৮ টা থেকে ১১ টা পর্যন্ত গাবতলী ও সায়েদাবাদ থেকে বাস ছাড়ে আমতলীর উদ্দেশ্যে। লঞ্চ- ঢাকা থেকে প্রতিদিন বিকাল ৫-৬ টা থেকে সদরঘাট থেকে লঞ্চ ছাড়ে আমতলীর উদ্দেশ্যে। এছাড়া মোটর সাইকেল, স্টিমার ভাড়া করে নিয়ে আসা যায়।

আমতলীতে ও তালতলী উপজেলায় উপরোক্ত দর্শণীয় স্থান ছাড়া আর কোন স্থান পরিলক্ষিত হলে যোগাযোগ করবেন। ধন্যবাদ।